প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী খোদা বখস্ চৌধুরী-এর ঘনিষ্ঠ ও জামাতপন্থী একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে নতুন সরকারের কাছে দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও সুবিধাজনক পদায়ন পাওয়া এই কর্মকর্তারা এখন নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্রিয়ভাবে তৎপর।
খোদা বখস্ চৌধুরী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ বাহিনীতে একের পর এক তার অনুসারী কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে বাহিনীর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ও বৈষম্যের সৃষ্টি হয়।বিশেষ করে স্বৈরশাসক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর শাসনামলে যারা রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত ছিলেন, পটপরিবর্তনের পরও তাদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত পদায়ন পাননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খোদা বখস্ চৌধুরীর আস্থাভাজন আইজিপি বাহারুল আলম এবং ডিএমপি কমিশনার শেখ মোঃ সাজ্জাদ আলী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে একক প্রভাব বিস্তার করেন। ঐ সকল কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই একটি নির্দিষ্ট বলয় গড়ে ওঠে, যা গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, খোদা বখস্ চৌধুরীর প্রভাবে জামায়াত পন্থি নিম্নোক্ত কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পান—সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজি সিবগাত উল্লাহ, পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর কাজী মোঃ ফজলুল করিম, শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসিম উদ্দিন, চট্রগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপি পদোন্নতি প্রাপ্ত আহসান হাবিব পলাশ, অতিরিক্ত আইজিপি ( প্রশাসন) একেএম আওলাদ হোসেন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার অতিরিক্ত আইজিপি পদোন্নতি প্রাপ্ত হাসিব আজিজ, বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি মঞ্জুর মোর্শেদ, ১৭তম ব্যাচের ডিআইজি আবু সুফিয়ান, পুলিশ হেড কোয়াটার্স ( নারী কেলেংকারীতে সমালোচিত) ১৮তম ব্যাচের সিলেট পুলিশ কমিশনার কুদ্দুস চৌধুরী, ২৪তম ব্যাচের অতিরিক্ত ডিআইজি (ম্যানেজমেন্ট-১) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত ডিআইজি (ম্যানেজমেন্ট-২) আবদুল্লা আল জহির ও অতিরিক্ত ডিআইজি (কল্যাণ) আহমেদ মুহিদসহ আরও পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে গুরুত্বপূর্ন পদে পদায়ন করে একক আদিপত্য বিস্তার করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব কর্মকর্তা এখনও স্ব স্ব পদে বহাল থেকে প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রাখছেন। উল্লেখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ সকল কর্মকর্তা জামাতকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য সক্রিয় ছিল।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ শরিয়তপুর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহমুদ হাসান বাকাউল-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর কাজী মোঃ ফজলুল করিমের বিরুদ্ধেও জামায়াতপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।নির্বাচনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হলে, তাকে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আ.ন.ম এহসানুল হক মিলন-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন করে প্রকাশ্যে ছবি তুলতে দেখা যায়, যা ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পদায়ন ও রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক নিয়োগ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। ১. সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধি লঙ্ঘন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘন। ২. পদায়নে স্বচ্ছতার অভাব যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।৩. প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্নসংবিধান অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী নিরপেক্ষ ও পেশাদার হওয়ার কথা থাকলেও এসব ঘটনায় সেই নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।৪. দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারএকই বলয়ের মাধ্যমে পদোন্নতি ও পোস্টিং হলে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান— “এই সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নতুন সরকারের আশ্রয়ে গিয়ে আগের মতোই প্রভাব বজায় রাখতে চাইছে। এতে বাহিনীর ভেতরে আবারও বৈষম্য ও হতাশা বাড়বে।” এছাড়া মেধাবী কর্মকর্তাগন তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তারা আশঙ্কা করছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রশাসন ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকারের উচিত—বিতর্কিত নিয়োগ ও পদোন্নতির পূর্ণাঙ্গ তদন্তনিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে মূল্যায়নরাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাস গ্রহণ করা।
খোদা বখস্ চৌধুরীর প্রভাব বলয়ে গড়ে ওঠা বলে অভিযোগ থাকা এই পুলিশ কর্মকর্তারা বর্তমানে নতুন সরকারের ছায়ায় নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে প্রশাসন ও সচেতন মহলের প্রত্যাশা—রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নয়, বরং আইন, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতেই পুলিশ বাহিনীর ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে, এই বিতর্কিত বলয় ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনার বলেন,“আমি কোনোভাবেই জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই এবং কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলাম না। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।”অন্যদিকে পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর কাজী মো: ফজলুল করিম প্রথমে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। পরে তিনি বলেন,“আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। ছবি তোলার বিষয়টিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এসব অভিযোগের কোনো বাস্তবতা নেই।”