হাঙ্গেরিতে দীর্ঘ ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান: বিরোধী জোটের বিশাল জয়!

হাঙ্গেরিতে দীর্ঘ ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান: বিরোধী জোটের বিশাল জয়!

আন্তজার্তিক ডেস্ক : April 18, 2026

হাঙ্গেরির কট্টর ডান প্রধানমন্ত্রীর ১৬ বছরেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে৷ দেশটির ইউরোপপন্থি রক্ষণশীল নেতা পিটার মাজার রোববার অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন৷ তবে দেশটির অভিবাসীদের জন্য দ্রুত বড় কোনো সুসংবাদ আসার সম্ভাবনা নেই।

পিটার মাজারের দল টিসজা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যা তাকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতা ভিক্টর অরবানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনার সুযোগ দেবে৷ অরবান রোববার রাতে পরাজয় স্বীকার করেছেন৷

ফলাফলের রাতে সমর্থকদের উদ্দেশে পিটার মাজার বলেন, “আমরা সবাই একসঙ্গে অরবান শাসনের পতন ঘটিয়েছি৷ আমরা হাঙ্গেরিকে মুক্ত করেছি, আমরা আমাদের মাতৃভূমি ফিরে পেয়েছি।

বুদাপেস্টে দানিউব নদীর তীরে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে আয়োজিত সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ তার এই বক্তব্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে৷ কেউ কেউ আতশবাজিও ফোটান৷

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৯৮.১৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে টিসজা পার্টি ১৯৯ আসনের মধ্যে ১৩৮টি আসন পেয়েছে এবং মোট ভোটের ৫৩.৫৬ শতাংশ অর্জন করেছে৷ অন্যদিকে অরবানের দল ফিদেজ পেয়েছে ৫৫টি আসন এবং ৩৭.৮৬ শতাংশ ভোট৷ এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল রেকর্ড ৭৯.৫০ শতাংশ৷ বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে মাঝারি জনসংখ্যার শহর ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে অংশগ্রহণ বেড়েছে৷

এর আগে ভিক্টর অরবান তার পরাজয় মেনে নিয়ে বলেন, ফলাফল “বেদনাদায়ক হলেও স্পষ্ট” এবং তিনি বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন৷

ইউরোপমুখী বার্তা

অরবানের এই পরাজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে৷ ৯৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ হাঙ্গেরিকে তিনি “অইলিবারাল গণতন্ত্র”-এর মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদী ও কট্টর ডানপন্থি শক্তির কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হতো৷

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সমর্থিত “মাগা” শিবির অরবানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল৷ নির্বাচনের আগে তারা বারবার সমর্থনের বার্তা দেয় এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বুদাপেস্ট সফর করেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেস বলেছে, এটি কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির জন্য একটি বড় পরাজয়, যার প্রতিধ্বনি হাঙ্গেরির সীমা ছাড়িয়ে যাবে৷

তারা আরও উল্লেখ করেছে, অরবানের রাজনৈতিক মডেলকে যারা অনুসরণযোগ্য মনে করতেন, তাদের জন্যও এটি একটি বড় ধাক্কা৷

ইউরোপের বিভিন্ন নেতা পিটার মাজারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন৷ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েক ম্যাক্রোঁ, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস এবং পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্ক শুভেচ্ছা জানান৷

ডোনাল্ড টুস্ক হাঙ্গেরীয় ভাষায় বলেন, রাশিয়ানরা, তোমরা নিজেদের দেশে ফিরে যাও”, যা অরবানের সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়৷

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লায়েন বলেন, “হাঙ্গেরি ইউরোপকে বেছে নিয়েছে৷”

নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সরাসরি মন্তব্য না করলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছিল যে অনেক সদস্য দেশ অরবানের অবস্থানে অসন্তুষ্ট ছিল৷ বিশেষ করে তিনি প্রায়ই ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ইউরোপীয় নীতি আটকে দিতেন৷ মার্চের শেষদিকে ইউক্রেনকে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ অনুমোদনও তিনি বাধাগ্রস্ত করেন৷

নির্বাচনী প্রচারে অরবান ইউক্রেনকে “শত্রু” হিসেবে তুলে ধরেন এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তিনি হাঙ্গেরিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে চান৷ তবে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও দুর্নীতির অভিযোগের কারণে এই বার্তা ভোটারদের খুব বেশি প্রভাবিত করতে পারেনি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা৷

সংস্কার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

পিটার মাজার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন বিশ্বস্ত সদস্য হিসেবে কাজ করবেন৷ তবে অরবানের মতো তিনিও ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর বিরোধিতা করছেন৷

তিনি বলেন, আজ হাঙ্গেরির জনগণ ইউরোপের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলেছে৷” পাশাপাশি তিনি দেশে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন, যা তিনি “একটি বিশাল কাজ” বলে উল্লেখ করেন৷

 

রাজনীতিতে নবাগত হলেও ফিদেজ দলের সাবেক সদস্য পিটার মাজার মাত্র দুই বছরের মধ্যে একটি শক্তিশালী বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন৷ ২০১০ সাল থেকে নিজের পক্ষে সাজানো নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তিনি অরবানকে পরাজিত করেন৷

নির্বাচনের দিন সকালে ভোট দেওয়ার পর অরবান বলেছিলেন, “আমি জয়ের জন্যই এখানে এসেছি” এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন৷

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বুলচু হুনিয়াদি বলেন, আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ডনাল্ড ট্রাম্পকে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা কঠিন হয়ে উঠেছিল, কারণ অনেকের কাছে তিনি অনিশ্চয়তার কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছেন৷

নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও ভিন্নমুখী৷ ৬২ বছর বয়সি শিক্ষক হাজনালকা গান বোজসোকিনে বলেন,

আমি খুবই দুঃখিত, কী হয়েছে বুঝতে পারছি না, তবে আমাদের ভিক্টর অরবান যেমন বলেছেন, আমি এই ফলাফল মেনে নিচ্ছি৷

অন্যদিকে ২০ বছর বয়সি শিক্ষার্থী জোলতান সিরোমি বলেন, “আমি দারুণ অনুভব করছি৷ আমরা অবশেষে এই ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছি, সময় হয়ে গিয়েছিল৷”

অভিবাসন নীত

অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে দুই নেতার অবস্থানে কিছু পার্থক্য থাকলেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা৷

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান দীর্ঘদিন ধরে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশ সীমিত করার নীতি অনুসরণ করেছেন৷ তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন বণ্টন ব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক কোটা ব্যবস্থারও বিরোধিতা করে আসছেন৷

অন্যদিকে পিটার মাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং সমন্বিতভাবে অভিবাসন ব্যবস্থাপনার পক্ষে কথা বলেছেন৷ তিনি ইইউর আশ্রয় ও অভিবাসন প্যাক্টের কিছু দিক নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিলেও, সীমান্ত সুরক্ষা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন৷

বিশ্লেষকদের মতে, তার নেতৃত্বে হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সংঘাত কমাতে পারে এবং আশ্রয় প্রক্রিয়ায় কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন আনতে পারে৷

তবে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসন সীমিত রাখার মূল নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না৷ ফলে অভিবাসীদের জন্য বাস্তবে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কমই থাকছে৷

Share This